মোঃ মামুন হোসেন
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি বহুদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনীতি কখনো সমাজ গঠনের হাতিয়ার, আবার কখনো বিভাজনের উৎস। অথচ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত জনসেবা—জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, রাজনীতি আজ একটি লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। এতে মানুষের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতা লাভই মুখ্য হয়ে উঠেছে। তাই সময় এসেছে আমাদের নতুন করে ভাবার—রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হবে, নাকি একটি মানবিক সমাজ গঠনের মাধ্যম?রাজনীতি একটি পবিত্র দায়িত্ব। এর মাধ্যমে সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। একজন রাজনৈতিক নেতার উচিত জাতির সেবক হিসেবে কাজ করা। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান বাংলাদেশে রাজনীতি অনেকাংশেই নীতিহীন দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, প্রতিহিংসা এবং দুর্নীতির আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই রাজনীতিতে আসছেন শুধু ব্যবসা বা নিজের আখের গোছানোর উদ্দেশ্যে। এতে করে সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে, নেতৃত্বে আসছে অযোগ্য এবং নীতিহীন মানুষ।রাজনীতি যখন পেশা হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর জনসেবার জন্য থাকে না; হয়ে যায় ক্ষমতা ও সুবিধা অর্জনের উপায়। তখন রাজনীতিকরা জনগণের সমস্যা শোনেন না, বরং কেবল নিজের পদ রক্ষা আর সুযোগের খোঁজে থাকেন। জনপ্রতিনিধিদের কাজ হওয়া উচিত জনগণের কথা শোনা, সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু পেশাভিত্তিক রাজনীতিতে এই মূল্যবোধ হারিয়ে যায়।
একজন প্রকৃত জনসেবক রাজনীতি করেন দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি জনতার সমস্যা নিজের সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু পেশাদার রাজনীতিবিদদের কাছে জনগণ কেবল ভোট ব্যাংক—শুধু নির্বাচনের সময় তাদের দরকার পড়ে, তারপর ভুলে যান সব প্রতিশ্রুতি।
আজ রাজনীতি এতটাই দলকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, দলের বাইরে মানুষ দেখা যায় না। ব্যক্তিগত বিবেক, ন্যায়বিচার বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বড় করে দেখা হচ্ছে। একজন মানুষ কেমন তা বিবেচনা না করে কেবল তার দলীয় পরিচয়ে তাকে মূল্যায়ন করা হয়। এটি সমাজে বিভেদ, বিদ্বেষ এবং সংঘাত সৃষ্টি করছে। অথচ একজন রাজনৈতিক নেতার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি একজন মানুষ, নীতিবান ও মানবিক।প্রথমে মানুষ হওয়া মানে হচ্ছে—সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহানুভূতি, এবং মানবিক গুণাবলির অধিকারী হওয়া। যে নেতা নিজের এলাকার দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন, যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন, সেই প্রকৃত নেতা। দলীয় পরিচয় তখনই অর্থবহ হবে, যদি তা মানুষের সেবায় ব্যবহৃত হয়।মানবিক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সহানুভূতি, সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ—এসব গুণ হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ একে অন্যকে সন্দেহ করে, বিশ্বাস করতে চায় না। রাজনীতির এই নেতিবাচক প্রভাব সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে নেতৃত্বে থাকতে হবে এমন মানুষ, যারা হৃদয়ে মানুষকে স্থান দেন। সমাজে বৈষম্য দূর করতে হলে দরকার মানবিক ও জনদরদি রাজনীতি।মানবিক রাজনীতির পুনরুদ্ধারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে: রাজনীতিতে যোগদানের যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা, চরিত্র, সমাজসেবায় সম্পৃক্ততা ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।দলীয় রাজনীতির বাইরে স্বচ্ছ নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি—যা জনসচেতনতা বৃদ্ধি করবে ও দলীয় দুষ্টচক্রকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। তরুণদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করা উচিত, তবে তা মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। শিক্ষিত, আদর্শবাদী ও সাহসী তরুণরাই রাজনীতিকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারেন।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে। জনস্বার্থবিরোধী নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে, আর সত্যিকার সেবক নেতাদের তুলে ধরতে হবে।
রাজনীতি যদি জনসেবার মাধ্যম না হয়ে কেবল পেশা হিসেবে পরিণত হয়, তবে তা জাতির জন্য অভিশাপ। সমাজে মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে আমাদের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক কর্মীদের মানুষ হতে হবে। দলীয় স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থই যেন সবার আগে হয়। রাজনীতি হতে হবে এমন একটি পথ, যেখানে মানুষ হাসবে, বাঁচবে, গড়ে উঠবে এক মানবিক বাংলাদেশ।তাই আজ এই আওয়াজ তুলতেই হবে—রাজনীতি হোক জনসেবার মাধ্যম, পেশা নয়। দল নয়, আগে মানুষ হওয়া জরুরি। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি স্বপ্নের সমাজ, একটি সোনার বাংলাদেশ।