শহর প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও শহীদদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশে ২০২৬ সালের নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। সেই আন্দোলনের শহীদদের অবদান খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “২৪ হয়েছিল বলেই ২৬ সালের নির্বাচন হয়েছে। ২৪ না হলে ২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। শহীদদের রক্তের বিনিময়েই আমরা আজ সরকারি ও বিরোধী দল হয়েছি। তাই তাদের অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না।”
তিনি ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করে শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় জনগণই সরকারের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ, ইসলামী ব্যাংকে হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি নিয়োগ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে একদলীয় শাসনের পথ তৈরি করা হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সরকার গঠনের আগে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কমেনি, বরং বেড়েছে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের পরিবর্তে সুবিধা পাচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী।”
নারায়ণগঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য পরিচিত এই শহর তার গৌরব হারিয়েছে। অতীতে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত হওয়া নারায়ণগঞ্জে আর কোনো ‘গডফাদার’ তৈরি হোক, তা জনগণ চায় না।
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এখনো চাঁদাবাজদের আতঙ্কে ভুগছেন এবং অনেকেই খোলামেলা কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ড্রেনের পানি দিয়ে যেমন অজু হয় না, তেমনি ভালো মানুষ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন সম্ভব নয়। সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব ছাড়া নিরাপদ ও সমৃদ্ধ নগর গড়া যাবে না।”
এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান। পাশাপাশি মহানগরীর বর্তমান অনির্বাচিত প্রশাসককে অপসারণের আহ্বান জানান।
সভায় ডা. শফিকুর রহমান আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মহানগর আমীর আবদুল জব্বারকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ২৭টি ওয়ার্ডে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হতে সক্ষম যোগ্য প্রার্থী দেওয়ারও ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা ১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বলেন- নারায়ণগঞ্জ সবসময়ই এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্দোলনের অন্যতম এক উর্বর ঘাঁটি। আজকের এই বিশাল কর্মী সমাবেশ প্রমাণ করে, শত জুলুম-নিপীড়ন চালিয়েও আল্লাহর জমিনে দ্বীন কায়েমের এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যায়নি, আর কোনোদিন যাবেও না। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ আজ ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে। এই স্বাধীনতাকে ধরে রাখা এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন সাদ্দাম দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদের চরম জুলুম-নিপীড়ন টেক্কা দিয়ে আজকের এই কর্মী সম্মেলন প্রমাণ করে—ইসলামী আন্দোলনকে কোনো শক্তি দমাতে পারে না। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ আজ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও তাদের দোসররা এখনো নানা চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্মীদের অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ০৩ এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের ভেতরের পরিবর্তন এবং সমাজের আমূল সংস্কার। আমরা এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে চাই, যেখানে আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম হবে। আর এই মহান দায়িত্ব সফল করার মূল চালিকাশক্তি হলেন আপনারা— জামায়াতের সম্মানিত কর্মীবাহিনী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা আবদুল জব্বার এবং সঞ্চালনা করেন যথাক্রমে সেক্রেটারী ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন, সহকারী সেক্রেটারী জামাল হোসাইন ও এইচ এম নাসির উদ্দিন ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা ১২ এমপি সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ০৩ এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলামসাদ্দাম, ঢাকা মহানগরী দক্ষিন সহকারী সেক্রেটারি ও ঢাকা ৫ এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আমীর মো. মমিনুল হক সরকার, জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান, আফজাল হোসেন কুষ্টিয়া ৪ এর এমপি, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবু সাঈদ মুন্না সহ, কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ।